#অন্তিম পর্ব | অমাবস্যার সেই রাত |কলমে ~©রিম্পা বিশ্বাস


হিমাদ্রি তাড়াতাড়ি  শুভ্রা কে  ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে মাথার ফাটা অংশের রক্ত টা পরিস্কার করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো , বসে রইল শুভ্রার মাথার কাছে , চেতন রাতের খাবার তৈরি করার উদ্যেশে রওনা হলো ।
খানিকক্ষণ পর শুভ্রার জ্ঞান ফিরলে শুভ্রা হন্ততন্ত হয়ে হিমাদ্রি কে প্রশ্ন করে সে কোথায় ছিল ; উত্তরে হিমাদ্রি জানায় ,
তুমি বাথরুম গেলে এদিকে কারেন্ট নেই ,ল্যাপটপ টা তেও চার্জ ছিল না যে কাজ করবো তাই মোবাইলের টর্চ টা জেলে নীচে খুড়োর কাছে গিয়েছিলাম ,আমার তো বাজার ঘাট করা সম্ভব হবে না প্রতিদিন, আর তুমিই বা একা অতো দূরে রোজ বাজার যাবে ,আবার এন জিওর কাজ আছে সে কথা ভেবে একটু আলোচনা করতে আর কী যদি কোনো লোক ঠিক করা যায় , আওয়াজ শুনে এসে দেখি তুমি এই অবস্থায় পড়ে , ভাগ্য ভালো শুধু মাথার উপর দিয়ে গেছে অন্য কোথাও চোট পাওনি তো?
নাহ তেমন চোট নয় এই হাত টা একটু মচকে গেছে ।
শুভ্রা তুমি তো যথেষ্ট হুঁশিয়ার মেয়ে ,তা পরে গেলে কিভাবে?
হুম ওই কথাটাই বলবো তোমায় ,আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমায় ফলো করছে বার বার কোন একটা ছায়ামূর্তি মনে হলো আমায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ,বাথরুম এও খেয়াল করেছি ।
শুভ্রার কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে হিমাদ্রি ,বি পজেটিভ শুভ্রা , তুমি একটা শিক্ষিত সাহসী মেয়ে হয়ে গ্রামের মেয়ে দের মতো  ইল লজিক্যাল কথা বোলো না প্লিজ ,
তা ছাড়া বাড়িটা আমার প্রথম থেকেই অপছন্দ এরকম একটা জঙ্গলের মধ্যে জনশুন্য এলাকায় আমার সুন্দরী বউকে রেখে অফিসে যেতে একটু কিন্তু বোধ হচ্ছিল বৈকি । তবে চেতন খুড়ো কে দেখে ওনার সাথে কথা বলে আমি একটু  নিশ্চিন্ত হয়েছি ,আসলে তোমার অন্ধকারে থাকার অভ্যেস নেই বলে এমন লাগছে , কথা বলতে বলতে দরজায় চেতন খুড়ো হাজির ,
বাবু আপনাদের জন্যে খাবার এনেছি , আজ রাতে একটু কষ্ট করে এই চিমনির আলো তে খেয়ে নিন ,বলে থালা দুটো মেঝের এক কোনে ঢাকা দিয়ে রেখে চলে গেল ।

শোনো শুভ্রা আমার খুড়োর সাথে কথা হয়ে গেছে তোমাকে আর কষ্ট করে রান্না করতে হবে না রান্নার কাজ টা উনি ভালোই করেন ,আর বাজার ঘাট নিয়েও কোনো অসুবিধা নেই উনি গ্রামের লোক দিয়ে আনিয়ে নেন ।

কথোপকথন শেষে দুজনে রাতের খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়ে ,মাঝরাতে হটাৎ শুভ্রার ঘুম ভেঙে যায় ,নিশ্বাস টা ভারী হয়ে আসছে দম নিতে তীব্র কষ্ট হচ্ছে , আধো আধো চোখ মেলে দেখে ঘরের এক কোনায় চিমনি টা টিমটিম করে জ্বলছে , সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করা ঘরে যেটুকু অক্সিজেন ছিল তা চিমনির শিখা জ্বলে শেষ হতে বসেছে , দেরি না করে তাড়াতাড়ি জানালা টা খুলে দিল ,সাথে সাথে একটা দমকা হাওয়া এসে ঘরে ঢুকে পড়ল চিমনি টা নিভে যাওয়ার উপক্রম হলো , সারা ঘর ময় একটা কালো ধোঁয়া পাক খাচ্ছে সোঁ সোঁ  শব্দ করে ,সাথে একটা বাদুড় এসে শুভ্রার ঘরের কাছ থেকে এক খাবলা মাংস মনে হয় ছিঁড়ে নিল তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বিছানায় এসে হিমাদ্রি কে ঠেলতে লাগলো ,হিমাদ্রি ধড়মড় করে উঠে মোবাইলের লাইট টা জেলে দেখে শুভ্রা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে , এই ঠাণ্ডায় ও কপালে ঘাম , হিমাদ্রি কে সব ঘটনা খুলে বলতেই হিমাদ্রি বোঝানোর চেষ্টা করে,
যে কিছুই না সে স্বপ্ন দেখছে , চিমনির কাছে গিয়ে দেখে তাতে তেল নেই একফোঁটাও ,নিভে গেছে ,
হিমাদ্রি কিছুক্ষন পর ঘুমিয়ে গেল শুভ্রা সেই রাত টা কোনোরকমে জেগে কাটিয়ে ভোর বেলার দিকে একটু ঘুমালো ।
সকালে আর বিরক্ত করলো না হিমাদ্রি শুভ্রা কে , নিজের মতো রেডি হয়ে বেরিয়ে গেল অফিসে।
একটু বেলার দিকে শুভ্রার যখন  ঘুম ভাঙলো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে দশটা বেজে গেছে , মাথায় ব্যথা টা রয়েছে বেশ ,
জানালা টা একটু খুললো শুভ্রা ,সকালের রবি উঁকি দিচ্ছে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ,
বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হতে গেল ।
সকালের জলখাবার সেরে  শরৎচন্দ্রের পরিনিতা পড়ছিল শুভ্রা ,চুল টা খোলা ,কিছুক্ষন পর সে অনুভব করলো কিছু একটা উপর দিকে উঠছে ওর চুল বেয়ে , ধীরে ধীরে  ঘাড় টা ঘোরাতেই শুভ্রা হতভম্ব হয়ে গেল,
খুড়ো তুমি ! না বলে হটাৎ ঘরে ঢুকে পড়লে যে বড় ? আর কি করতে যাচ্ছিলে শুনি ,
নাহ ,মা জননী ভুল বুঝো নি আসলে আমি তোমায় দুপুরের খাবার খানা দিতে এসেছিলুম ,ঘরে ঢুকে দেখি  এই চার পেয়ে পোকা টা তোমার চুল ধরে উপরের দিকে ...
তাই মেরে ফেললুম , জংলী এলাকা চারিদিকে কত কীটপতঙ্গ ঘুরে বেড়ায় তুমি একটু সাবধানে থেক মা জননী।
বলে চলে গেলেন ,
দুপুরের খাবার পর একটু চোখ লেগে এলো  শুভ্রার ,হটাৎ চুলে তীব্র টান অনুভব করায় ঘুম টা ভেঙে যেতেই শুভ্রার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো, সে দেখে চেতন খুড়ো  অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে চার পায়ে ভর দিয়ে ,জিভ টা কে একহাত লম্বা বের করে তার চুল টা চেটে যাচ্ছে , লালা রসে তার চুল টা ভিজে আঠার মতো সেঁটে যাচ্ছে ,চোখ দুটো ভয়ঙ্কর রখম জ্বলজ্বল করছে ,মনে  হচ্ছে এখুনি ঠিকড়ে বেরিয়ে আসবে , শুভ্রা তীব্র চিৎকার করতেই সে হন্ততন্ত হয়ে দৌড়ে পালালো ,
সারাটা দিন ঘরের মধ্যে কোনোরখমে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কাটিয়ে দিলো  শুভ্রা ,
বিকেল হতে না হতেই ফিরে পড়লো হিমাদ্রি আজ সময়ের আগেই ফিরে পড়েছে সে ,দরজার বাইরে হিমাদ্রি শুভ্রা বলে ডাকতেই দৌড়ে এসে দরজা খোলে শুভ্রা , হিমাদ্রি কে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে ,
হিমাদ্রি আমি খুব ভুল করেছি তোমার কথা না শুনে ,আমাদের এখানে আসা টা মোটেও উচিত হয় নি ,এখানে আর এক মুহূর্ত নয় চলো তুমি আর আমি এখুনি চলে যাই , সবটা এক নিঃশ্বাসে বলে যায় সে ।হিমাদ্রি শুভ্রার বিধস্ত চেহারা দেখে  শুভ্রা কে থামিয়ে দিয়ে সবটা জানতে চায় , সবটা শুনে হিমাদ্রি শুভ্রা কে বলে অফিসে গিয়েই তার সন্দেহ হয় কিছু ঘটনা কিছুতেই মিলছিল না , তারপর রাতের সব ঘটনা একে একে হিসাব করতে ব্যাপার টা আরো জটিল হয়ে ওঠে ,শুভ্রা  আমাদের সাথে ফ্রড হয়েছে ,পুরো ব্যাপারটাই সাজানো ,
ঘটনার সূত্র পাত আমাদের গাড়ি টা খারাপ হওয়া থেকে ,তোমার মনে পড়ছে শুভ্রা আমাদের গাড়ি টা কিন্তু সার্ভিস করানো হয়েছিল সদ্য ,অথচ ঠিক সেদিন ই খারাপ হলো , তারপর মনে পড়ে তোমার কেউ ভরদুপুরে আসতে রাজি হচ্ছিল না তখন একটা ট্যাক্সি রাজি হয়েছিল , কিন্তু সে আমাদের দেয়া ঠিকানায় বাঙলো না দেখিয়ে এখানে এনেছে ,আজ অফিসে এই বাঙলোর বর্ণনা দিতে গণপতি মশায় জানায় আমার বর্ণনা দেওয়া বাঙলোর সাথে নাকি অফার করা বাঙলোর কোনো মিল নেই , তারপর তোমার মনে আছে চেতন খুড়ো  বলেছিলেন সেন বাবু নাকি বলেছিলেন আমরা আসবো এখানে ,তুমি জানো শুভ্রা ওই কদিন সেন বাবু ছুটি তে ছিলেন আর আমি বাঙলো দেখতে আসবো বলে কোনো আলোচনা করিনি ওনার সাথে ,একটা খটকা আমার আগেই লেগেছিল কিন্তু গুরুত্ব দিইনি, খুব অদ্ভুত লাগলো যখন আজ সকালে অফিসে যাবার সময় দেখি রাস্তায় কোনো গাছ পরে নেই অথচ কাল চেতন খুড়ো বললো পোলে নাকি গাছ ভেঙে পড়েছে , তার পর তোমার কাল মাথা ফাটা ,বাথরুম এ গিয়ে ভয় পাওয়া , মাঝরাতে উঠে অস্বাভাবিক ব্যাবহার সবটা একে একে সাজাতে মনে হলো একটা বড় গোলমাল আছে , অফিসে গিয়ে কাজে মন লাগাতে পারিনি ,তাই এখন তাড়াতাড়ি ফিরে পড়লাম ,  কিন্তু এ কি অবস্থা হয়েছে তোমার, পুরো ব্যাপারটাই একটা চক্রান্ত ,এখানে আর থাকা যাবে না , চলো আমরা এখুনি বেরিয়ে পরি ,আসবাবপত্র পরে লোক আনিয়ে নাহয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে ।
হিমাদ্রি আর শুভ্রা বেরোতে যাবে এমন সময় দরজায় চেতন হাজির ,
কোথায় চললেন কত্তা ,এতো তারা কিসের ,
চুপ শয়তান তোর সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেছে ,আমরা পুলিশ ডাকবো তারপর তোর ব্যাবস্থা করবো ।
তাই নাকি পুলিশ ডাকবেন তা ডাকুন দেখি ; সব যখন ফাঁস হয়েই গেল তখন আমারও আর কোনো দায় থাকে না ভালোমানুষ সেজে বসে থাকার , অনেক নাটক হয়েছে এবার তবে সোজা কথা টা সোজা ভাবেই বলি , আপনারা যতই চেষ্টা করুন যেতে পারবেন না আপনাদের গাড়ি এখন জঙ্গলের দিঘির জলে ডুবে , পায়ে হেঁটে এই জঙ্গল পারি দেবেন বুঝি ?
চুপচাপ খাবার দিচ্ছি খেয়ে ঘুমিয়ে যান আর মা জননী আজ আমার জিম্মায় থাকবেন এই একটা দিনের জন্যে বহু বছর অপেক্ষা করছি ।
আপনাদের আমার কথা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই ।
চেতন চলে যাবার পর শুভ্রা হিমাদ্রি কে বলে , খেয়াল করেছ হিমাদ্রি আজ সেই বিরল অমাবস্যা বছরে একবার আসে ,বাইরে তাকিয়ে দেখো রাতও আজ কালো চাদরে ঢেকেছে নিজেকে , ছোটবেলায় ঠাম্মার কাছে শুনেছি বছরে এই অমাবস্যায় নানান মহাজাগতিক শক্তির আগমন ঘটে এই পৃথিবীতে , কিছু অশরীরী আত্মা মুক্তি প্রাপ্ত হয় এই দিনেই ,
দুজনেই ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমে ঢুলে পড়লে একটা ,দরজা ভাঙার শব্দে চোখ মেলে দেখে একটা ভয়ানক জন্তু দরজায় , বড় বড় লোম সারা শরীরে ,বড় বড় নখ ,চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে , ঠিক যেন আগুন ঠিকড়ে বেরিয়ে আসছে , সুচালো দাঁত , শুভ্রা কে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে ,শুভ্রার গগন বিদারক আর্তনাদ এ সারা জঙ্গল কেঁপে উঠলেও সাহায্য করার জন্যে কেউ ছিল না ,
জন্তুটার পিছনে পিছনে হিমাদ্রি ও দৌড়ালো কিন্তু ততক্ষণে শুভ্রা কে নিয়ে জঙ্গলের অতলে তলিয়ে যাওয়া জন্তুটার নাগাল সে পেল না ,রাগে ,দুঃখে  সেদিন হিমাদ্রি হয়েগিয়েছিলো আপাদমস্তক উন্মাদ ...
এইভাবেই একটা সুখী সংসার এর পতন , আর একটা জঙ্গলের অভিশাপ মোচন হয়েছিল সেদিন । যার  সাক্ষী হয়ে রয়ে যায় সেই অমাবস্যার রাত।।।

কাহিনীর সমস্ত চরিত্র ,স্থান ,ঘটনাবলী ,সম্পূর্ণ কাল্পনিক, কোনো কাহিনীর সাথে মিল থাকলে তা সম্পূর্ণ কাকতলীয় ।
Previous
Next Post »

Translate